দ্বন্দ্ব

 

 

ঘন্টা দুই হয়ে গেল, কাধ-পিঠ-কোমড় সমস্ত যেন ধরে আসছে, তার ওপর আবার পিঠের ওপর ওজন খানেকের একটা কাসার থালা মানে দাদুযে ঠিক কি করতে চায় তা আমার মাথায় ঢোকেনা গত তিনদিন হলো আমাকে কুকুর কামড়িয়েছে, তারপর থেকে থালাপড়া, পানপড়া, তেলপড়া আরো কত কি যে  চলছে আমার ওপর দিয়ে কে জানে। বাবা বলেছিল বর্তমানে ডাক্তারের প্রযুক্তি অনেক দূর এগিয়েছে আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে দু-তিনটা সুই দিলেই ভালো হয়ে যাব। সুই ব্যাপারটাতে আমার ভয় আছে ঠিকই তাই বলে এসব তো আরো বিরক্তিকর।
 

দাদু বেজায় রগচটা মানুষ গ্রামের প্রধান তার ওপরে গ্রামের এমন কোনো মানুষ নেই যে তার ওপর কথা বলতে পারে। বাবাও পারে না, তা আমি কোথাকার হরিদাস পাল! এইতো কাল সকালে কোথেকে একটা কলা এনে আমাকে দিয়ে বললো দাদু এটা খেয়ে নাও তো তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাবে একটা কথাও না বলে  আমি খেলাম, কি বিচ্ছিরি এক প্রকার গন্ধ বেরোচ্ছিলো সেটা থেকে তা ভাষায় বোঝাতে পারব না। কিছু বলতেও পারি না কারন মানুষটাকে বেশ ভালোবাসি আমি ছোটোবেলায় যখন পড়া না পারার অপরাধে মা পাখা দিয়ে মারতে আসতো তখন দাদু বলতো আহা ওকে মারছো কেন, সময় হলে আপনা থেকেই সব শিখে যাবে। তারপর প্রতিটা সময় আমাকে আগলে রাখা, খেলনা কিনে দেওয়া আর সব আবদার গুলো এই দাদুই পূরণ করতো

 

আমার দাদুর কথা যতই বলি ততই কম বলা হবে, লোকটা কখনো কারো কাছে মাথা নত করেনি, মাথা নত করার মত কোনো কারন যে কখনো ঘটেছে তা এই মুহূর্তে মনে পরছে না আমার। যেদিন আমাকে কুকুরটা কামড়ালো বাবা বললো বাবুকে আমি হাসপাতালে নিয়ে যাব  দাদু বললেন তার কোনো দরকার নেই, এমন কত মানুষ কলা পড়া, থালা পড়া দিয়ে ঠিক হয়ে গেল বাবা কি একটা বলতে যাবে দাদু বললো আর একটাও কথা না,  সামান্য ক-ব শিখে অনেক বড়ো ভাবছো নিজেছে বাবা চুপ করে সেখান থেকে চলে গেল

 


বাবা গ্রামের স্কুলের ভুগোল শিক্ষক, তাকে বাড়িতে কম স্কুলে বশি দেখা যায় স্কুলের কোনো শিক্ষক উপস্থিত না থাকলে মাঝে মাঝে বাংলাটা, ইংরেজীটা, বিঞ্জানটাও সে নিয়ে নেয়, মদ্দাকথা গ্রামের স্কুল যে নিয়মে চলে আর কি!

 

কাল রাত থেকেই আমার শরীরটা কেরকম খারাপ হয়েছে, জ্বর আসছে ঘন-ঘন, কেমন একটা অজানা ভয় মনের মধ্যে বাঁসা বেঁধে আছে ভয়টা ঠিক কিসের তা আমিও ধরতে পারছি না এমন সময় থালাটা মাটিতে পড়লো, হাফ ছেড়ে বাঁচলাম, কবিরাজ মশাই বললেন “বিষ তো বেশ খানিকটা আছে, ওকে নিয়মিত সকাল-বিকেল খালি পেটে কাঠাল গাছের ছাল বাটা খাওয়ান, আর মাছ-মাংসের কাছে যেন একদম না ঘেসে” দাদু সায় দিয়ে বললেন বেশ। সকাল-বিকালে খালি পেটে কিভাবে কাঠালের ছাল বাঁটা খাব সে নিয়ে একবার ভাবতে যাব, এমন সময় মাথাটা কেমন ঘুরতে শুরু করল দাদুর হাত ধরে সেই অবস্থাতেই বাড়ি এলাম। রাস্তায় দাদু কত কি যে বললো তার একটা কথাও আমার কানের পাশ দিয়েও গেল না।

 

আমার নাম খোকন, মা আদর করে খোকা বলে ডাকে। বাবা বাবু বলে আর দাদু দাদু আমি সবে সবে ছয় ক্লাস পাশ করে সাত ক্লাসে উঠেছি গ্রামের পুব কোনে যে স্কুলটা আছে ওটা আমার স্কুল আমাদের বাড়িতে মা, বাবা, দাদু আর আমি বাদেও আমার কাকা থাকে, ভদ্রলোক বাস্তব মানুষদের থেকে একদম আলাদা কারোর সঙ্গে তিনি খুব বেশি কথা বলেন না, শুধু চুপ চাপ করে বাড়ির কোনে তার তৈরি করা ল্যাবে গোটাদিন ধরে চিনি-মাখন-দই নিয়ে কি সব করে ভগবানই জানেন। মাঝে মাঝে আমাকেও দেখায়, দেখতে বেশ ভালোই লাগে এইতো আজ সকালেই মাকে ডেকে বললো, বৌদি একটু চিনি দেওতো মা রান্না ঘর থেকে চিনির কৌটটা আমাকে দিয়ে পাঠিয়ে দিল কাকুর কাছে, কাকুকে প্রশ্ন করলাম তুমি চিনি দিয়ে কি করবে? কাকু বললো দেখবি একটা সাপ বানাবো চিনি দিয়ে সাপ খানিনটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম সেদিকে, সাপের কথা শুনে দাদুও বাইরে থেকে ভেতরে এসে বসলো, দেখলাম কাকু চিনির মধ্যে কি একটা জলের মতো টুপ টুপ করে ওপর থেকে ফেলছে আর চিনি থেকে একটা কালো সাপের মত দ্রুত বেগে বাইরে বেরিয়ে আসছে, আমি প্রায় অবাক, কাকুকে বললাম এটা কিকরে হলো? কাকু বললো এটা সালফিউরিক অ্যাসিড আর চিনির বিক্রিয়া তুই যখন বড়ো হবি তখন বইতে পড়বি।

 

সালফিউরিক অ্যাসিডের বোতলের পাশে আরেকটা বোতল ছিল, খানিকটা কৌতুহল বসত বোতলটা দেখিয়ে কাকুকে জিঞ্জেস করলাম, ওটাও কি সালফিউরিক অ্যাসিড, কাকু বললো না ওটা পটাসিয়াম সায়ানাইট আমি বললাম ওটা দিয়েও এমন সাপ হয়, কাকু বললো না ওটা দিয়ে অন্য রকম অনেক কিছু হয়, তোকে অন্য দিন দেখাবো, তবে ওটা খুব বিষাক্ত, কেউ যদি ভুলেও এক ফোটা খেয়ে নেয় তবে সে মা বলবার আগেই মারা যাবে, আমি খানিকটা ভয় পেলাম  তারপর আবার সাপের খেলা দেখতে মন দিলাম তখনো সেই সাপ বড়ো হয়েই যাচ্ছে

 


রাতে আমার এখন ঘুম হয় না, মাথা যন্ত্রনা করে, মাঝে মাঝে বমি করি মা এসব দেখে বাবাকে বলে তুমি ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও না কেন? তুমি কি চোখের সামনে আমাদের খোকাকে মরতে দেখবে? তুমি যদি না নিয়ে যাও তবে আমি কাল ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব

 

বাবা চুপ করে থাকে, বাবা শিক্ষিত মানুষ, তাই ঝাড়-ফুক, পান পড়া, কলা পড়ায় বিশ্বাস করে না, তবুও সে তার বাবার মুখের ওপরে কথা বলতে কোনো সাহস পায় না মাকে শান্তনা দিয়ে বলে, শান্ত হও কাল শনিবার আধ বেলা স্কুল, স্কুল বন্ধ হলে আমি বাবার সাথে কথা বলে ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।

 

কোনো কিছুই আর পরের দিনের অপেক্ষায় রইলো না, সেদিন বিকালেই আমার রক্ত বমি শুরু হলো, বাবা বাইরে একটা কাজে গিয়েছিল পাড়ার একটা ছেলেকে দিয়ে তাকে ডেকে আনানো মা। বাবা এসে দেখলো মার কোলে আমি মৃতপ্রায় শিশুর মত পরে আছি গোটা দুয়ার ভরে আছে রক্তে বাবা সেসব দেখে আর কোনো কথা না বলে, আমাকে কোলে নিয়ে সোজা চলে গেল দাদুর কাছে।

 

দাদু তখন গ্রামের এক কৃষকের ছাগল চুড়ি নিয়ে মিটিং বসিয়েছে গ্রামের সমস্ত লোক সেখানে উপস্থিত এমন সময় বাবা আমাকে কোলে নিয়ে সেই মিটিং এ উপস্থিত হলো, এবং দাদুকে বললো, বাবা আমি বাবুকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছি, তোমার পাপড়া, থালাপড়ার চিকিৎসা দিতে থাকলে একদিন আমার বাবুকে আমি হারাবো এই বলে বাবা আমাকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা হলো

 

আমার আধোখোলা চোখে আমি যতটুকু দেখতে পাচ্ছিলাম, তাতে দেখলাম দাদুর মুখ আগ্নেয়গিরির মত লাল হয়ে গিয়েছে, সে গিরি তখন না ফাঁটলেও খুব তারাতারি যে ভয়ঙ্কর রূপ নেবে তা আন্দাজ করে বলা খুব কঠিন কিছু নয়।

 

গতবার বাবা তার মুখের ওপর একটা বড়ো কথা বলায়, সে বাবাকে শিক্ষ্যা দেবার জন্য কাকার ল্যাব থেকে কি একটা অ্যাসিড চুরি করে খেতে যাচ্ছিল ভাগ্যিস শেষ মুহুর্তে কাকা এসে তাকে আটকেছিল বলেই রক্ষ্যে এবার বাড়িতে নয়, কোনো ছোটো-বড়ো কথাও নয় এত গুলো মানুষের সামনে তাকে অপমান করা হয়েছে সে নিশ্চই এবার আরো বড়ো কিছু ঘটাবে, ঠিক কি ঘটাবে তার অনুমান করা আমার ছোটোমাথার পক্ষে সম্ভব নয়।


 

হাসপাতাল সেখান থেকে ঘন্টা খানেকের পথ রাস্তায় আরো একবার আমি বমি করলাম শুধুই রক্ত বমি, নিজের বমি দেখে নিজেরই কেমন ভয় হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল এই বুঝি দুটা পরি এসে আমাকে বলবে “এই বাচ্চা যাবি না আমার সাথে চল” আমার চোখ বুঝে এলো

 

যখন ঘুম ভাঙলো তখন প্রায় সন্ধা বাবা বাড়ি গেছে মা পাশে বসে আছে  আমার শরীরটাও কেমন ক্লান্ত শুন্য লাগছে, একটু আরাম পেলাম, মনে হলো ভালো হয়ে যাবো আমি কি কথা বলতে যাচ্ছিলাম, মা বললো এখন কথা বলিস না খোকা, ডাক্তার তোকে ঘুমোতে বলেছে।

 

এমনি করে দুদিন কেঁটে গেল, আমি এখন বেশ সুস্থ বাবার মুখে শুনেছিলাম আমাকে যে কুকুরটা কামড়িয়েছিল সেটা পাগল কুকুর ছিল। শুনলাম কাল সকালে আমাকে ছেড়ে দেবে বাবাকে বললাম আমি ভালো হয়ে গেছি? বাবা বললো হ্যাঁ পুরোপুরি একটা অদ্ভুত আনন্দ অনুভব করলাম। আবার বাড়ি যাব আমি বাবাকে কাছে জানতে চাইলাম বাড়ির সকলে কেমন আছে? বাবা বললো তোর কাকার ল্যাব থেকে পটাসিয়াম সায়ানাইট এর বোতলটা পাওয়া যাচ্ছে না, সেটা নিয়ে সে গোটা বাড়ি মাথায় করে রেখেছে তার অনুমান গত বারের মতন এবারো বাবা অ্যাসিড খেয়ে কোনো একটা বিচ্ছিরি কান্ড ঘটাবে এই দুদিনে তোর দাদু আমার সাথে টু শব্দটি করে নি, শুধু ভুল বসত কখনো সামনে পরে গেলে লাল চোখে আমাকে দেখেছে, তার চাহুনি দেখে আমার মনে হয়েছে সে বিশাল বড়ো কিছু একটা না ঘটিয়ে থামবার নয়।

 

এখন বিকেল ঠিক ৪ টা,  ঘড়ির কাটা টিক টিক শব্দ করে ঘুরে চলেছে, আমার সামনে দাদু বসে আছে, আজ দুদিন বাদে দাদু আমাকে দেখতে এসেছে, হাতে একটা গ্লাস, গ্লাসের মধ্যে দুধের মত কিছু একটা দাদু জিঙ্গেস করল দাদু কেমন আছো? আমি  বললাম ভালো, তারপর সে কেমন আছে জিঞ্জাসা করলাম সেও বললো ভালো আছি। আমি বললাম দাদু তোমার হাতে ওটা কি? দাদু বললো এটা আমাদের গ্রামের তান্ত্রিক বাবার দুধপড়া, এটা তুমি খেয়ে নাও। আমি বললাম এটা খেলে কি হবে? দাদু বললো, তুমি একদম সুস্থ হয়ে যাবে; আমি প্রমাণ করেই ছাড়ব তোমার বাবা ভুল আমিই ঠিক বর্তমান ডাক্তারি ব্যাবস্থা থেকেও ঝার-ফুক অনেক বেশি কার্যকরি। আমি তো ঠিক হয়ে গেছি তবে এই দুধ খেলে এমন কি হবে যাতে প্রমাণ হয়ে যাবে ডাক্তার ভুল পানপড়া, থালপড়া এসব ঠিক! এতসব ভাববার আগেই দাদু দুধের গ্লাস টা আমার হাতে দিল, আমি গ্লাস টা হাতে নিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম, আকাশে কালো মেঘ জমেছে, আজ বোধহয় বৃষ্টি হবে।


এরকম আরো গল্প পড়তে ও নিজের গল্প প্রকাশ করতে আজই যুক্ত হন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে- WhatsApp