ম্যাকবেথ‘, উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের সৃষ্টি কালজয়ী নাটক। কলজয়ী চরিত্র। যে কিনা ট্রাজেডির নায়ক হিসাবে আজও পরিচিত। স্কটল্যান্ড এর রাজা ডানকানের বিশ্বস্ত এক যোদ্ধা, বিশ্বস্ত এক থেন থেকে কিভাবে তিন উইচ-এর ভবিষ্যৎবাণী ম্যাকবেথকে রাজা হওয়ার নেশায় মত্ত করে তোলে এবং সে হয়ে ওঠে এক বিশ্বাসঘাতক, এক খুনি; এবং তার ভয়ানক পরিণতি আজও ট্রাজেডির নায়ক করে রেখেছে ম্যাকবেথকে। শুধু ম্যাকবেথই নয়, ম্যাকবেথ-এর উচ্চাভিলাষী স্ত্রী, বন্ধু ব্যাংকো, ব্যাংকর ছেলে ফ্লিয়ানস, রাজা ডানকান, ডানকানের ছেলে ম্যালকম, রাজার বিশ্বস্ত ম্যাকডাফ, তিন উইচ এই প্রতিটি চরিত্র যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে শেক্সপিয়ারের কলমে। এই তিন উইচ বা ডাইনি ম্যাকবেথ এবং ব্যাংকোকে ভবিষ্যদ্বাণী করে জানিয়েছিল ম্যাকবেথ একদিন স্কটল্যান্ডে রাজা হবে এবং ব্যাংকোর উত্তর পুরুষেরা একদিন স্কটল্যান্ডে সিংহাসনে বসবে। এই ভবিষ্যৎ বাণী শোনার পর ম্যাকবেথ স্ত্রীয়ের প্ররোচনায় কিভাবে একে একে রাজা ডানকান,  বন্ধু ব্যাংকোকে খুন করে এবং শেষে প্রচন্ড অপরাধবোধ কিভাবে ম্যাকবেথ এবং তার স্ত্রীকে গ্রাস করে যার ভয়ঙ্কর পরিণতি হয় মৃত্যু তাই রয়েছে ম্যাকবেথ-এ।

এই নাটকটি নিয়ে চলচ্চিত্র জগতে চিত্রায়নও হয়েছে বহুবার। তবে এই প্রথম আমাদের বাংলা ভাষায় এই নাটকটির একটি অ্যাডাপটেশন করা হয়েছে ওয়েব সিরিজ রূপে। যার পরিচালনায় রয়েছেন আমাদের সবার প্রিয় অনির্বাণ ভট্টাচার্য। যিনি কিনা একাধারে থিয়েটার অভিনেতা, রুপোলি পর্দার অভিনেতা, গায়ক। এবং এর মধ্যে সবকটি ভাবেই তার কাজে গুনমুগ্ধ হয়েছে প্রচুর দর্শক। অনির্বাণ যে লম্বা রেসের ঘোড়া এবং একজন বহুমুখী প্রতিভা সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এবার তার কর্মজীবনের আরেকটি নতুন ধাপ যুক্ত হলো পরিচালক হিসাবে। এবং পরিচালক হিসেবে তাঁর পরিচালিত প্রথম কাজ, ওয়েব সিরিজ ‘মন্দার’। যা কিনা শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ থেকে অনুপ্রাণিত এবং ম্যাকবেথের একটি বাংলা অ্যাডাপ্টেশন।

ইতিমধ্যেই এই ওয়েব সিরিজটি মন কেড়েছে প্রচুর দর্শকের। অনেকের মতে এই ওয়েব সিরিজটি বাংলা ওয়েব সিরিজ দুনিয়ায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

‘মন্দার’ বলতে গিয়ে যেসব বিষয় গুলির কথা না বললেই নয় তারা হলেন এই ওয়েব সিরিজের চরিত্রগুলি এবং গেইলপুর নামক এক গ্রামের প্রেক্ষাপট। প্রতিটি চরিত্র ভীষণ নিখুঁত এবং স্বতন্ত্র। মন্দার এর চরিত্রে অভিনয় করেছে নবাগত দেবাশিস মন্ডল। যার বলিষ্ঠ ও সাবলীল অভিনয়ে গুনমুগ্ধ হয়েছেন বহু দর্শক, যা কিনা প্রশংসার দাবি রাখে। এবং মন্দারের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন সোহিনী সরকার। ষড়োরিপুতে পরিপূর্ণ কোন মানুষের যদি একটি চিত্র রূপ দেওয়া যায় তবে সেটি মন্দার স্ত্রী লায়েলী। যে ভীষণ উচ্চাভিলাষী এবং তার যা চাই তা সে আদায় করে নিতে জানে। যেটাকে অসম্ভব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সোহিনী। মন্দারে তার অভিনয় দেখে এটুকু বলাই যায় যে তার অভিনয় জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয় তিনি ঢেলে দিয়েছেন মন্দারে। গেইলপুরের  এক নামী ব্যবসায়ী ডাবলু ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন দেবেশ রায়চৌধুরী। যিনি গেইলপুরের মাথা। তার অধীনে কাজ করে মন্দার ও বঙ্কা। এখানে বঙ্কার চরিত্রে অভিনয় করেছেন শংকর দেবনাথ। মন দারোকা ডাবলু ভাইয়ের কথা মত কাজ সেরে ফেরার সময় এক ঝড় বৃষ্টির রাতে দেখা পায় একটি কালো বিড়ালের। সে বিড়ালটি তাদেরকে পৌঁছে দেয় মজনু বুড়ি এবং পেদোর কাছে। এখানে এক অসম্ভব সুন্দর ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ড সৃষ্টি করা হয়েছে। এখানে এই কালো বিড়ালটি, মজনু বুড়ি এবং পেদো যেন এক অদ্ভূত দুনিয়ার বাসিন্দা। এরা যেন মানুষকে হিপনোটাইজ করতে পারে এবং বিড়বিড় করে বলে চলে বিভিন্ন ভবিষ্যৎবাণী। এবং এদের বলা ভবিষ্যৎবাণী হুবহু মিলেও যায়। মজনু বুড়ি সারাদিন বলে চলে ‘যে বাঁজা, সে রাজা’। সেদিন রাতে মন্দার ও বঙ্কা তাদের কাছে গেলে তারা বলে ওঠে  ‘কালের কূলে কপাল ফেরে। কেউ রাজা, কেউ রাজার বাপ।’ এর মানে দাঁড়ায় মন্দার রাজা হবে অর্থাৎ হয়ে উঠবে গেইলপুরের মাথা এবং বঙ্কা হবে রাজার বাপ। এই অদ্ভুত ভবিষ্যৎ বাণী শুনে মন্দারের মাথায় চেপে ওঠে রাজা হওয়ার লালসা। এই কথা সেটা স্ত্রীকে জানালে তা স্ত্রীয়ের উচ্চাভিলাষ আরও বেড়ে যায় এবং মন্দারকে বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করতে থাকে। এইভাবে ডাবলু ভাই, বঙ্কাকে খুন করে মন্দারের গেইলপুরের রাজা হওয়ার নেশায় মত্ত হওয়া এবং তার পরিণতি নিয়েই এই ওয়েব সিরিজটি।

এখানে উইচ অর্থাৎ ডাইনি হিসেবে মজনু বুড়ির চরিত্রে সজল মন্ডল এবং পেদোর চরিত্রে সুদ্বীপ ধাড়ার অভিনয় রীতিমত নজর কেড়েছে। মজনু বুড়ির বিড়বিড় করা ‘যে বাঁজা, সে রাজা’ যেনো কানে বাজছে বারবার।

এই ওয়েব সিরিজতে দর্শকের মন করার মতন অন্যতম দুটি বিষয় হলো অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি এবং গেইলপুর-এর ভাষা। গেইল পুরের ভাষা যেন আলাদা একটি সিনেমাটোগ্রাফিক ল্যাঙ্গুয়েজ সৃষ্টি করে দিয়ে গেছে। বাংলা ভাষার একটি ধারাকে যে এত সুন্দরভাবে এই ওয়েব সিরিজটি তে দেখানো হয়েছে যা রীতিমতো বাংলা ভাষাকে নিঃসন্দেহে এক সম্মানের জায়গায় পৌঁছে দেয়।

কিন্তু মন্দার কিভাবে রাজা হয়ে উঠলো বা আদৌও কি রাজা হয়ে উঠলো আর উঠলেও রাজপাঠ সামলানো কি অতই সহজ অথবা কালের কূলে কার কতোটা কপাল ফিরলো নাকি আবার একই পুনরাবৃত্তি এই প্রশ্নগুলি বারবারই ভাবাবে দর্শককে। সবমিলিয়ে ওয়েব সিরিজটি দেখার পর মনে এই প্রশ্নটি আসতে বাধ্য ‘ মন্দার নাকি ম্যাকবেথ! নাকি মন্দারই ম্যাকবেথ।’ অর্থাৎ মন্দার কতটা ম্যাকবেথ হয়ে উঠেছে এবং তার জীবনের ট্রাজেডি কতটা ম্যাকবেথ-এর জীবনের ট্রাজেডির সাথে মেলে জানতে হলে দেখুন ওয়েব সিরিজটি।