আকাঙ্ক্ষা সাহিত্য পত্রিকা

  

আকাঙ্ক্ষা সাহিত্য পত্রিকা, akankkha sahitya patrika

 

আমার শিক্ষক বলেছিলেন – ” মৃত্যু মানেই কি শুধু এই দেহের মরণ রে ! মানুষ বেঁচে থাকতে থাকতেই কত কিছুরই অকালমৃত্যু ঘটে যায় চোখের সামনে।স্বপ্ন,আশা ,বিশ্বাসের…….।”
তখন এই কথার অর্থ কতটা বাস্তব তা বুঝে উঠতে পারিনি যদি না তা এই জীবন নামক ব্যাপারটি এক চিলতে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমার সামনে তুলে ধরত।
    রতনকাকু আমাদের গ্রামেরই একজন প্রতিবেশী।একজন মানুষের সবদিক থেকে সুখী হওয়ার জন্য যা যা আবশ্যক সবকিছুই রয়েছে রতনকাকুর। হয়তোবা আবশ্যিকতার  সীমা ছাড়িয়েও অনেককিছুই রয়েছে। এককথায় স্ত্রী ও পুত্র নিয়ে সুখী গৃহকোণ।সেদিন কোনো এক দরকারে গিয়েছিলাম রতনকাকুর বাড়িতে।
   – রতানকাকু, রতনকাকু। বাড়িতে আছ?
   – কে?
   – আমি, আমি…
নাম বলার আগেই দরজা খুলে রতনকাকুর ছেলে ঋজু বেরিয়ে এল।ঋজু আমার চেয়ে দু’বছরের  ছোটো । খুব ভালো পড়াশোনায়।শুধু পড়াশোনাই নয় গানের গলাও রয়েছে দুর্দান্ত। খুব সুন্দর বাঁশিও বাজাতে পারে। আমায় দেখে ঋজু বলল – হ্যাঁ দিদি বল কি দরকার ?বাবা এখনো ঘুমাচ্ছেন শরীরটা ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছে।
   – ও আচ্ছা।বিকেলে আসব তাহলে। এখন  আসি।
    –  ঠিক আছে দিদি । বিকেলে এসো।
ঋজু দরজা লাগাতে যাবে ঠিক সেই সময় আমি বললাম – ঋজু , বাঁশির কতগুলো নতুন সুর শিখলি?
  আমার মনে হল আমার প্রশ্নটা যেন অজান্তেই ঋজুর কোনো গভীর ক্ষতের ওপর গিয়ে আঘাত হানল। নিজেকে সামলে নিয়ে ঋজু বলল – না না দিদি নতুনকিছু আর শেখা হয়নি।বরং পুরোনো সুরগুলোও যেন ভুলে গেছি।
     – সে কি ঋজু ! তুই তো খুব সুন্দর বাঁশি বাজাস।
     – আর বাঁশি দিদি।পড়াশোনার চাপে পড়ে…..
  ঋজুর গলা কেমন যেন অদ্ভুতভাবে বন্ধ হয়ে গেল। আমি তাড়াতাড়ি করে বলে উঠলাম – আচ্ছা, চলি রে। বিকেলে আসব।
  সেদিন বিকেলে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি রতনকাকুর বাড়িতে। কারণ বিকেলের ট্রেনেই  আমি মেদনীপুরে চলে এসেছিলাম।তারপর নিজের জগতে হারিয়ে যাওয়া। পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকায় একমাস আর বাড়িও যাওয়া হয়ে ওঠেনি।ফোনের মাধ্যমে যতটুকু খোঁজখবর।বাড়ি ফিরে জানতে পারি আমি চলে যাওয়ার দিনই ঠিক সন্ধ্যেবেলায় রতনকাকু স্ট্রোকে মারা যান।তারপর থেকে ইন্দু কাকিমা পাথর হয়ে গিয়েছেন।পাগলের মতো আচরণ করছেন। তাছাড়া এই কথাও জানতে পারি যে রতনকাকুর মৃত্যুর আগে গত কয়েকদিন ধরেই ঋজুর গানবাজনা নিয়ে খুব অশান্তি চলেছিল রতনকাকুর সুখের অন্দরমহলে।রতনকাকু রেগে গিয়ে ঋজুর বাঁশি পর্যন্ত ভেঙে দিয়েছিলেন। এত সহজ সরল মানুষটা কিভাবে ঋজুর মতো বিনয়ী ছেলের সাথে এতটা রূঢ় আচরণ করতে পারলেন তাই ভেবে উঠতে পারছিলাম না।পরেরদিন সকালে রতনকাকুর বাড়িতে পা রেখে অনুভব হল হঠাৎ এক ঝড়ো হাওয়ার কবলে পড়ে কিভাবে তিল তিল করে সযত্নে গড়ে তোলা সুখের নীড়টি  তছনছ হয়ে গেছে।সদর দরজা খোলাই ছিল।ঋজুর মাসিমাকে দেখতে পেয়ে বললাম – মাসিমা, ঋজু কোথায়?
    – ওপরে আছে হয়তো দ্যাখো। কি থেকে যে কি হয়ে গেল!
আমি কিছু না বলেই ঋজুর সাথে দেখা করার জন্য ওদের বাড়ির ভেতর ঢুকলাম।ইন্দু কাকিমাকে দেখে বুকের ভেতরটা হঠাৎ  মোচড় দিয়ে উঠল। পরিচিত হাসি – খুশি মুখটা আজ বড়ই অচেনা, সুন্দর ঝলমলে রোদের পরিবর্তে কালো মেঘে ছেয়ে গেছে সুন্দর পরিষ্কার আকাশটা । ওপরে উঠে ঋজুর ঘরে পৌঁছে দেখি বিছানার ওপর একটা ভেঙে যাওয়া বাঁশির একখন্ড পড়ে রয়েছে। আর একখন্ড হাতে নিয়ে শূন্যতা ভরা মন নিয়ে বেদনা জড়ানো কণ্ঠে ঋজু গাইছে – 
     ” গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে 
                ভেবেছিল একটি পাখি
          হঠাৎ বুকে বিঁধল যে তির
                  স্বপ্ন দেখা হল ফাঁকি…. “।
                                                 ( শ্যামল মিত্র)
সেদিন আমি দেখেছিলাম কিভাবে মানুষ বেঁচে থাকলেও মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে যায় স্বপ্ন ভাঙার মধ্য দিয়ে।সেদিন আমি দেখেছিলাম কিভাবে আনন্দের অকালমৃত্যু হয়। কিভাবে আশার অকালমৃত্যু হয়।কিভাবে সুখের অকালমৃত্যু হয়।এক লহমায় সবকিছু কেমনভাবে মৃত্যুবরণ করে নিয়েছিল এই মরপৃথিবীর বুকে , ঋজুর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম আমি। দেখেছিলাম বুকভরা সুরে তিরবিদ্ধ এক পাখির যন্ত্রণা যা গোপনে গুমরে গুমরে শেষ হচ্ছে। এই জীবন সেদিন আমাকে চুপি চুপি বলেছিল  – ” কত কাহিনী লেখা রয়েছে তোমার পায়ের নীচ দিয়ে চলে যাওয়া ওই পথে, কত যন্ত্রণা মিশে রয়েছে ওই ধুলোতে , কিন্তু জীবনপথিক তুমি থেমো না এগিয়ে চলো , থেমো না তুমি পথিক , থেমো না”।

 আকাঙ্ক্ষা সাহিত্য পত্রিকা, akankkha sahitya patrika

“আকাঙ্ক্ষা সাহিত্য পত্রিকা” য় সকলকে স্বাগত। আপনি যদি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হন তবে আহই যুক্ত হন আকাঙ্ক্ষা সাহিত্য পত্রিকায়। প্রতি শনিবার এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়। লেখা পাঠান [email protected] ইমেলে।

এবং “আকাঙ্ক্ষা সাহিত্য পত্রিকা” র হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হতে চাইলে ক্লিক করুন পাশে থাকা লিঙ্কে- WhatsApp

সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি চাকরির খবর সহ সমস্ত স্কলারশিপ ও সরকারি প্রকল্পের খবর সবার আগে পেতে আজই প্লে-স্টোর থেকে ডাউনলোড করুন আমাদের WB Job News অ্যাপ।

 

Download WB Job News Android App