Akankkha-sahitya-patrika

কিরিং… কিরিং… কিরিং…

-শুনছো ফোনটা ধরো না…

– হ্যাঁ ধরছি, এখন আবার কে ফোন করলো! 

-হ্যালো… হ্যাঁ বলছি…, আপনি কে বলুন তো? হ্যালো…হ্যালো…..ওওও!

– কে ফোন করছে?

– সেই একই ফোন, আপনি কি নিলাদ্রী রায় বলছেন, আপনি যেটা করছেন ভালো করছেন না। ব্যস ফোন কেটে দিল।

– যবে থেকে এই ফ্ল্যাটটা নিয়েছি, তবে থেকে জ্বালাচ্ছে। আমি বলি কি তুমি একবার থানায় যাও। ব্যপারটা খুলে বলো সৌগত বাবুকে ।

– তুমি ঠিকই বলেছ রচনা। ব্যাপারটা সৌগত বাবু কে জানানো উচিত।

– তুমি একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছো ঠিক রাত বারোটাতেই ফোনটা আসে কিন্তু!

– তুমি ঠিক বলেছো। না না কিছু একটা করতে হবে আমাকে বুঝলে!

– যাক খেতে দিয়েছি, খাবে এসো।

– যাই।

নিলাদ্রী রায় । পেশায় উকিল। বয়স সদ্য পঞ্চাশ পেরিয়েছে। বাবা মা দেশের বাড়ি বীরভূমে থাকেন। এক দাদা আমেরিকা থাকেন বৌ আর একটা বাচ্চা নিয়ে।

তার সাথে ফোনে ছাড়া তেমন যোগাযোগ নেই বললেই চলে। কাজের সুত্রে সে বালিগঞ্জের একটা ফ্লাটে থাকেন বৌ রচনা ও  আট বছরের ছেলে রনিকে নিয়ে। বৌ হাউস ওয়াইফ। নিলাদ্রী একটু বেশি বয়সেই বিয়ে করেছেন।

অভিজাত বংশের ছেলে নিলাদ্রী রায়। তার দেশের বাড়ি বীরভূমে মাঝে মাঝে যায় বাবা মা কে দেখতে। বাকি সময় কাজে ব্যস্ত। সত্যিই খুব ব্যস্ত উকিল সে, বাড়ি ফিরতে প্রায়ই দেরি হয়, যেমন আজ ফিরেছেন রাত সাড়ে এগারোটায়।

রাতের খাবার খেয়ে নিলাদ্রী শুয়ে পড়ল কারণ কাল সকাল সকাল বেড়তে হবে একটা কেসের শুনানি আছে।

– আমি অফিস বেরোচ্ছি। 

– এক মিনিট বাবুকে ব্রাশ করাচ্ছি।

– ওহো! আজ তাড়াতাড়ি যেতে হবে একটা কেসের শুনানি আছে।

– এই যে।

– আজ বাবুর স্কুল নেই? এতো বেলায় ব্রাশ! শোয়াআটটা বাজে। নিলাদ্রী বলল।

– না গো, আজ ওদের স্কুলে কি মিটিং আছে।

– ও ঠিক আছে আমি বেরুলাম।

– আর শোননা যদি সময় হয় থানায় একবার_ বেশ ভয়ের স্বরেই বলল রচনা!

– হ্যাঁ মাথায় আছে। চলি।

– ঠিক আছে।

বলুন নিলাদ্রী বাবু আপনার জন্য কি করতে পারি। পুলিশ ইন্সপেক্টর সৌগত রায় কথাটা ছুঁড়ে দিলেন নিলাদ্রীর দিকে।

-আজ্ঞে স্যর। রোজ ঠিক রাত্রি বারোটায় আমার ফোনে একটা ফোন আসছে কিন্তু কে করছে কোথা থেকে করছে কিছুই বলছেন না। শুধু আমার নাম জিজ্ঞেস করছে আর বলছে আপনি যেটা করছেন ভালো করছেন না। ব্যস ফোন কেটে দিচ্ছে।

– দেখুন আপনার বন্ধুদের মধ্যে কেউ রসিকতা করছে।

– না স্যার! বন্ধুদের মধ্যে কেউ রসিকতা করবে না। কারণ সেই ধরনের বন্ধু আমার নেই কিন্তু যদিও বা রসিকতা করে তাহলে পরে নিশ্চয়ই তা বলবে। আর সব চেয়ে বড় কথা কন্ঠটা একটা মহিলার। আমার রসিকতা করার মতো কোনো মহিলা বন্ধু আমার নেই।  ঘটনাটা এক বছর ধরে চলছে। কাজের চাপে ব্যাপারটাকে অতো গুরুত্ব দিইনি। এখন তো দেখছি রোজের রুটিন হয়ে গেছে।

– আপনার ক্লায়েন্টও হতে পারে! বিশ্বয়ের স্বরে বললেন ইন্সপেক্টর সৌগত রায়।

– ক্লায়েন্ট! সে কি করে হয়!! নিলাদ্রী বলল।

– রসিকতা নয়। হুমকি হতে পারে। আপনি কি রিসেন্ট কোন কেস স্টাডি করছেন কি। মানে খুব জটিল ধরনের।

– জটিল কেস! নিলাদ্রী একবার তার চশমার ডাটিটা দাঁতে আলতো করে কামড়ে ধরলো। খুবই চিন্তিত গলায় বলল। হ্যা ছিল একটা কেস তিন বছর ধরে চলছিল-

নিলাদ্রী র কথার উপরে ছেদ পড়ল। সৌগত বাবু বিস্মিত গলায় বললেন। -চলছিল মানে!

নিলাদ্রী বলল চলছিল মানে আজ তার নিস্পত্তি হলো। কেসটায় আমার জিত হয়েছে।

এবার একটু বেশি বিস্মিত হলেন সৌগত বাবু!! বললেন ‌।- কিসের কেস?

– ধর্ষণ।

– সেই গনধর্ষণের কেসটা! দোষীরা সাজা পেল তবে এতদিনে।

নিলাদ্রী বলল। – না।

– না মানে! কি বলছেন কি? ওমন নৃশংস ভাবে মেয়েটাকে অত্যাচার করে মার্ডার করে পার পেয়ে গেল কি করে?

– মানে উপযুক্ত প্রমানের অভাবে। নিলাদ্রী বলল।

– ও সিট্! কিন্তু প্রথম দিকে তো বেশ জোরালো প্রমান ছিল।

– তা ঠিক কিন্তু টিকলো না। প্রত্যক্ষদর্শীরা পাল্টি খেয়ে গেল আমার জেরায়। আরে বাবা আমি হচ্ছি দুঁদে উকিল আমার কাছে পাত্তা পায়।

– তাহলে তো আপনি বেশ খুশ মেজাজেই আছেন কি বলেন! পার্টি কবে দিচ্ছেন?

– তা বলতে পারেন। ও অনেক কাঠ পোড়াতে হয়েছে তিনটে বছর ধরে। হবে হবে পার্টি। যাক ওসব কথা, কাজের কথায় আসি। আমার ব্যাপারটা তাহলে কি করবেন।

-দেখছি দেখছি। আপনি একবার টেলিফোন অফিসে যোগাযোগ করুন।

– গেসলাম। ওরা যে কল লিস্ট দেখালো তা সন্দেহ জনক কোন নাম্বার পেলাম না।

ইন্সপেক্টর সৌগত রায়ের কাছে আশ্বাস নিয়ে উঠে পড়লো নিলাদ্রী বাড়ির উদ্দেশ্যে।

বাড়ি ফিরে নিলাদ্রী তার স্ত্রীকে খুব আনন্দের সাথে ডেকে উঠল।

– রচনা… রচনা শুনছো?

রচনা শোবার ঘরের থেকে বেরিয়ে এলো, বলল।

 – কি হলো বলো, অতো চেঁচামেচি করছো কেন?

নিলাদ্রী এবার উচ্চ স্বরে হাসতে হাসতে বলে উঠল। 

-জিতে গেছি জিতে গেছি কেসটা!

– কোন কেসের কথা বলছো বলতো? রচনার গলায় বিস্ময়!

– সেই কেসটা। ও! দীর্ঘ তিনটে বছর আমাকে নাজেহাল করে ছেড়েছে। সেই ধর্ষণের মামলাটা ! এবার বুঝতে পেরেছো!

– ও…! এতোদিনে নিস্পত্তি হলো তাহলে। তাহলে তো বেশ ভালই ইনকামের কথা।

রচনা চোখ বড়বড় করে বললো!

– হ্যাঁ। পুরো পঞ্চাশ লাখ। টিকতেই পারলো না অপনেন্ট উকিল শিবতোষ বাবু।

রচনা উৎফুল্ল ভাবে বললো। – কি করে?

– আরে যা প্রমান-টমান ছিল আমার ক্লায়েন্ট, চেনতো মন্ত্রী কপিল গুপ্তা। সব টাকা দিয়ে কিনে নিলো। ওর ছেলেই প্রধান জরিত এই কেসটায়। সব ভন্ডুল হয়ে গেল। তারপর আমার জেরার ঘোরপ্যাচে মামলা আমাদের হাতে চলে এলো। বেকসুর ছাড়া পেয়ে গেল ওরা চারজন।

– তাহলে কি ভাবছো? রচনা বলল।

-কিসের?

– বলছি একটা পার্টির ব্যবস্থা করো জেতার আনন্দে। আমার বহুদিনের সখ বেশ জোরালো একটা অনুষ্ঠানের। সব কতো লোকজন আসবে, নানান খাবারদাবার হবে। উঃ কি আনন্দটাই না হচ্ছে আমার। মনে হচ্ছে দুহাত তুলে নাচি।

– বেশি নেচো না পড়ে যাবে।

– বাপী আমার ভিডিও গেম? হঠাৎ রনি সেখানে এসে বলে উঠল।

নিলাদ্রী প্রথমে চমকে উঠল। তারপর বলল।

– হবে হবে। মা-র আবদার তোমার আবদার সবার হবে। বড় অনুষ্ঠান হবে আগামী রবিবার। ছেলেকে উদেশ্য করে বলল। – এখন যাও বাবা ঘুমিয়ে পড়ো অনেক রাত হলো।

রনি হাসি মুখে তার ঘরের দিকে অগ্রসর হলো।

রচনা বলে উঠল। – কবে পাবে?

-কি?

– পঞ্চাশ লাখ।

হা হা করে হেসে উঠলো নিলাদ্রী তারপর বলল।

-টাকা এ্যাকাউন্টে ঢুকে গেছে ম্যাডাম।

রচনা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ টেলিফোনটা স্বশব্দে বেজে উঠল।

-ঐ যাও তোমার টেলিফোন এসে গেছে। রচনা বলে উঠল।

নিলাদ্রী ফোনটা ধরতেই আবার ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো সেই মেয়েলি কন্ঠস্বর। নিলাদ্রী বলে।

-আপনি কে বলুন তো! নিলাদ্রী বাকি কথা বলতে পারলো না, দেখলো জানালার বাইরে থেকে একটা কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঘরের মধ্যে প্রবেশ করছে। সেই ধোঁয়ায় সমস্ত ঘর ভরে গেল। তার মধ্যে থেকে প্রকট হচ্ছে একটা উলঙ্গ নারী মূর্তি। সমস্ত শরীর থেকে কাঁচা রক্ত ঝরে পড়ছে। কি বিভস্ত সেই মূর্তি। রচনা নিলাদ্রী র ডান হাতটা চেপে ধরেছে। চোখে মুখে আতঙ্ক!

বিকট খনা খনা গলায় বলে উঠল সেই মূর্তি টা।

– কাজটা কি তুই ঠিক করলি নিলাদ্রী রায়। টাকার লোভে ঐ অমানুষ পাষন্ড গুলোকে বাঁচিয়ে দিলি। আমার দেহটাকে নিয়ে ওরা ছিঁড়ে খেয়েছে। তারপর আমার দেহটাকে কেটে টুকরো টুকরো করে জলে ভাসিয়ে দিয়েছে।

– কে কে তুমি! ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল রচনা।

– আমি তোর মতোই একটা মেয়ে। নিলাদ্রী র দিকে ফিরে বললো। নিলাদ্রী আমার জায়গায় যদি তোর বৌ হতো কি করতিস রে নরাধম। বল বল বল…! বিকট শব্দে হাসতে থাকলো সে। সমস্ত ঘরটা দুলতে লাগলো, আলো গুলো দপ দপ করে যাচ্ছে সমানে। এক নারকীয় তান্ডব শুরু হয়ে গেল ঘরময়। নিলাদ্রী র গলায় কোন স্বর নেই কে জেনো তার কন্ঠরোধ করে রেখেছে। শুধু ঠকঠক করে কাঁপছে। রচনা আগেই মূর্ছা গেছে। এবার মূর্তিটা নিলাদ্রীর দিকে এগিয়ে এলো।

– তুই বাঁচবি না, বাঁচবি না! তুই পাগল হয়ে যাবি তুই।

নিলাদ্রী অস্ফুট স্বরে বলল। – ক্ষমা করে দাও আমাকে। ক্ষমা করে দাও!

– ক্ষমা! হা হা হা হা হা।

প্রচন্ড শব্দে হাসতে থাকলো। আর দেহের থেকে রক্ত গুলো নিয়ে নিলাদ্রীর দিকে ছুঁড়তে লাগল। বেস কিছুক্ষণ চলল এমন ভীষণ ভয়াবহ পরিস্থিতি। নিলাদ্রী র সমস্ত শরীর টা রক্তে লাল হয়ে উঠলো। আর তক্ষুনি সে জ্ঞান হারালো।

পরদিন সকালে নিলাদ্রী হাসপাতালে র বেডে শুয়ে তখনও জ্ঞান ফেরেনি তার। রচনা বেডের পাশে বসে। নিলাদ্রী র বাবা মা নাতিকে নিয়ে বসে আছেন বাইরে।

ইন্সপেক্টর সৌগত রায় এগিয়ে এলেন রচনার দিকে। বললেন।

– শুনছেন মিসেস রায়! একবার বাইরে আসবেন প্লীজ।

রচনা হতভম্বের মতো উঠে বাইরে বেরিয়ে এলেন।

– আচ্ছা রচনা দেবী ঠিক কি হয়েছিল একটু বলবেন! আপনি বসুন এখানে।

রচনা নিশ্চুপ! মাথা নিচু করে ঠায় বসে রইলেন। প্রায় পাঁচ মিনিট। তার মুখ চোখ থমথমে।

– কি হলো বলুন?

আরো কিছুক্ষন চুপ থাকার পর রচনা গতকাল রাতের সমস্ত ঘটনাটা খুলে বললেন।

রচনার মুখে সমস্ত ঘটনাটা শুনে তাজ্জব হয়ে গেলেন সৌগত বাবু। বিস্মিত হয়ে বললেন! – কি বলছেন কি! এ আবার হয় নাকি!

বিশ্বাসই করতে পারছেন না তিনি।

হঠাৎ ভীষণ চেঁচামেচি শুনে এগিয়ে গেল তারা! ঘরে এসে অবাক হয়ে গেল। নিলাদ্রী র জ্ঞান ফিরেছে আর বিকট চেঁচাচ্ছে সে দুহাত কানে চেপে।

– বাজজে!… আবার বাজজে! ফোনটা বন্ধ করো…! বন্ধ করো! বন্ধ করো…!!

সৌগত বাবু বললেন। -কি ব্যপার ডাক্তারবাবু! ও এমন করছে কেন?

ডাঃ সুমন সরকার বললেন। – ইমেডিয়েট মেন্টাল হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। অবস্থা খুব খারাপ!

নিলাদ্রী কিন্তু সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে।

ধরাধরি করে নিলাদ্রী কে ঘুমের ইনজেকশন দিলেন। তারপর আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে গেল নিলাদ্রী।

রাতে কিছুতেই ঘুম এলোনা রচনার। নিলাদ্রী র ওমন মর্মান্তিক অবস্থা দেখে খুব ভেঙে পড়েছে সে। নিলাদ্রী মেন্টাল হসপিটালে কি করছে! ভেবে ভেবে চোখ ছলছল করে ওঠে। ভীষণ ভয় করছে তার! একবার ভাবলো পাশের ঘরে তার শ্বশুর শাশুড়ি নাতিকে নিয়ে ঘুমচ্ছে তাদের একবার ডাকবে! না! বিছানা থেকে উঠে পড়লো সে। আস্তে আস্তে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে। আর তক্ষুনি বিকট শব্দ করে টেলিফোনটা বেজে উঠলো!