Akankkha-sahitya-patrika

 গ্রামটির নাম গোবিন্দপুর। আধুনিক সভ্যতার থেকে অনেক দূরে এই ছোট্ট গ্রামখানি। গ্রামের বেশিরভাগ ঘরই মাটির, তবে বেশ কয়েকখানা পাকাবাড়িও আছে। যেগুলির মালিকেরা বেশ অবস্থাপন্ন,শহরে থাকেন। মাঝে মাঝে মেলার সময় বা অন্য কোনো কাজে গ্রামে বেড়াতে আসেন। গ্রামে সারা বছরে শুধুমাত্র একটিই মেলা হয়……..

পৌষ-সংক্রান্তির মেলা। এটাই গ্রামবাসীদের সারা বছরের একমাত্র মহোৎসব। গ্রামে অন্যান্য পুজো-পার্বণ,উৎসব-অনুষ্ঠানও হয়। কিন্তু এই মেলার কাছে সবকিছুই নগণ্য। বাঙালির যেমন প্রধান উৎসব দুর্গোৎসব, ঠিক তেমনি এই গ্রমটিরও প্রধান উৎসব এই পৌষ-সংক্রান্তির মেলা। 

       এই গ্রামেরই প্রায় শেষ প্রান্তে পশ্চিমদিকে এক অতি পুরোনো বিশাল বটগাছ আছে। সে যেন কয়েক দশকের সাক্ষী বহন করে চলছে। বিশাল বিশাল ঝুরি মাটিতে নেমে অনেকখানি জায়গা দখল করে আছে। এই গাছটির মালিক  কৃষ্ণগোপাল মিত্র, একজন নামকরা অধ্যাপক। তিনি কলকাতায় থাকেন। গ্রামে তার বাড়িটি ফাঁকাই পড়ে আছে। একজন মালি শুধু বাগান ও বাড়ি দেখাশোনা করে।মিত্রমহাশয় বছরে একবার কি দুবার নিজ বাড়িতে সপরিবারে আসেন। চার-পাঁচদিন থেকে চলে যান।

      গ্রামের উত্তরে এক অতি জির্ণ কুটিরে বাস করে রঘুনাথ দাস। রঘুনাথের কেউ নেই। তিনি বিপত্নীক। ছেলেমেয়েও নেয়। বছর দুই আগে যক্ষ্মায় স্ত্রীর মৃত্যু হয়। সেই থেকে তিনি একলা ওই কুটিরে থাকেন। গ্রামের কারোর সাথেই তার বড় একটা মেলামেশা নেই। কেবল কাছেই চক্রবর্তীদের বাড়িতে মাঝে মাঝে একটু ঘুরতে যান। বড় একলা মানুষ রঘুনাথবাবু। তবে রঘুনাথবাবুর একজনের সঙ্গে বড়ই বন্ধুত্ব। তার কাছে দিনে দুবার যাতে না পারলে যেন তার আশ মেটেনা। এই বন্ধু আর কেউ নয় সে হলো — গ্রামের শেষপ্রান্তের সেই বিশাল পুরনো বটগাছটি। রঘুনাথবাবু ছোট থেকেই এই বটগাছটিকে দেখে আসছেন।আজ তার বয়স প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই। কিন্তু এতকাল পরেও ছেলেবেলার বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা একটুকুও ম্লান হয়নি। বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ছোটবেলায় রোজ দুবেলা এসে বটের ডালে চরে খেলতেন। এখন দুবেলা এসে বটের ছায়ায় বসে চোখ বন্ধ করে সময় কাটান। যেনো মনে মনে এই বুড়ো বটকে নিজের সুখদুখের কাহিনী শোনান। বটও তার শুখদুখের কথা রঘুনাথবাবুকে শোনায়। কখনও যদি কেউ বটের একটা কি দুটো ডাল কেটে নিয়ে যায়, বন্ধুর দুর্দশা দেখে রঘুনাথবাবু মনে মনে দুঃখ পান। ইচ্ছা করে বরং করবেন। কিন্তু পরক্ষনেই ভাবেন…..কী করে বলব! এ কী আর আমার সম্পত্তি। তবুও চোখের জল বাধা মানেনা। মূক বন্ধুটিও বন্ধুর মনের কথা জানতে পেরে নীরবে তাকে সান্তনা জানায়- কেঁদো না বন্ধু কেঁদোনা। আমি তো আর মানুষ নয়, তাই আমার দুঃখ- কষ্ট কেও বোঝেনা। তার ওপর কত বয়স হয়ে গেছে। গাছ বলেই তো আমার কোনো দাম নেই। তবুও তুমি আমার ব্যাথা বোঝো।এটুকুই বা কে পায় বলো! তোমাকে সেই ছোট্টবেলা থেকে দেখে আসছি। তোমার আপন বলে কেও নেয়….আমি ছাড়া। দুটো ডাল কেটে নিলে আমার বড়জোর একটু ব্যাথা লাগবে। ওই ক্ষত তো কিছুদিনের মধ্যেই সেরে যাবে। কিন্তু তোমার চোখের জল দেখলে তো আমার বুক ফেটে যায়। 

        বটের কথা বুঝতে পেরে রঘুনাথবাবু মনকে বোঝান। চোখের জল মুছে বটের ছায়ায় বসে কাটান ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তারপর যাওয়ার সময় পাশের পুকুর থেকে জল এনে বটের গোড়ায় দেন। বটের ওই মস্ত গুঁড়িতে হাত বোলাতে থাকেন আর বলেন -“আজকের মত যায় বন্ধু, কাল আবার আসবো।” 

        এইভাবে দিন যায়,মাস যায়,বছর যায়। রঘুনাথবাবুর বয়স বাড়তে থাকে। এই মূক বন্ধুর সাথে রঘুনাথবাবুর সম্পর্ক যেন আরোও গভীর হয়ে ওঠে। বটকে না দেখে তিনি একদিনও থাকতে পারেন না।

         অবশেষে একদিন কৃষ্ণগোপাল মিত্র গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন। তিনি শহরে অধ্যাপনার পাশাপাশি একটি ব্যাবসাও করতে চান। তাই গ্রামের সমস্ত বিষয়-সম্পত্তি বিক্রি করে দিতে চান। তারপর সমস্ত জমিজায়গার কাগজপত্র ঠিক করে বিক্রি করার চেষ্টা করেন।

        সব ঠিকঠাক। বিক্রির ব্যবস্থা পাকা। একদিন রঘুনাথবাবু বটগাছের কাছে আসার সময় একজন সম্ভ্রান্ত লোকের সাথে কথা কৃষ্ণগোপাল মিত্রাকে কথা বলতে শোনেন। বৃদ্ধ নিরক্ষর রঘুনাথ তাদের আলাপ-আলোচনার  কোনো কথায় বুঝতে পারেন না। 

         অবশেষে কৃষ্ণগোপাল মিত্র সমস্ত বিষয়-সম্পত্তি একজন ব্যাবসায়ীর কাছে বিক্রি করে কলকাতায় চলে যান। প্রতিদিনের মত রঘুনাথবাবু সেদিন দুপুরে বটের কাছে এসেছেন। প্রতিদিনের মতোই বটের গায়ে হাত বুলিয়ে মনে মনে কথা বলছেন। হঠাৎ ছয়-সাতজন ঠিকাদার এসে হাজির। তারা রঘুনাথবাবুকে বলে ” আরে দাদু, সরে যান, গাছটা কাটতে হবে। দেরি করা চলবেনা।” শুনেই বৃদ্ধ রঘুনাথের মাথায় বজ্রাঘাত। তিনি কিছুক্ষনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যান। অবশেষে বলেন -“তা বাপু, এই গাছটাকে তোমরা কেনো কাটবে? এর মালিক তো এখন কলকাতায়।” ঠিকাদাররা বলে -“ও তা আপনি জানেন না যে এই গাছের মালিক তো তার সব সম্পত্তি বিক্রি করে চলে গেছেন। আর এখানে একটা গুদামঘর হবে। এবার তাড়াতাড়ি সরুন, আমাদের তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে।” রঘুনাথবাবু সব কথা শুনে বুঝতে পারেন তিনি নিরুপায়, তিনি তো মালিক নন, কাজেই তার কথা কেউ শুনবে না। অবশেষে তিনি বটগাছের একটি পাতা ছিঁড়ে মনে মনে বলেন -“বিদায় বন্ধু, তোমার এই স্মৃতিটুকুই আমার সম্বল। তুমি আমার জন্য অনেক করেছ। কিন্তু আমি কিছুই করতে পারলাম না।” খুব কষ্টে চোখের জল সংবরণ করে তিনি বাড়ির পথ ধরেন। বটগাছও তার বন্ধুকে শেষ বিদায় জানায়। দূর থেকে গাছ কাটার শব্দ আসতে থাকে। সেই শব্দে রঘুনাথের হৃদয়টিও খন্ড খন্ড হয়ে যেতে থাকে।

       সারা দুপুর রঘুনাথবাবু অনাহারে থাকেন। অবশেষে সন্ধ্যার কিছু আগে বটগাছের জায়গাটিতে যান। গিয়ে দেখেন কিছু নেয়। সব ফাঁকা। শুধু আশেপাশে ভাঙা ডালপালা ও পাতা পোড়ে আছে। এরপর আর রঘনাথবাবু নিজেকে সামলাতে পারেন না। ডুকরে কেঁদে ওঠেন। আকাশের দিকে চেয়ে বলেন -“হায় ভগবান। এ তোমার কেমন বিচার। পৃথিবীর কোনো আদালতেই কি এর বিচার নেই,এই বটগাছ এত বছর ধরে এই মাটি আঁকড়ে ধরেছিল। এই সামান্য জমিতেও কি তার অধিকার নেই। মানুষ সবকিছু দখল করেছে। তবুও তারা কি এই সামান্য জায়গাটুকু গাছটাকে দিতে পারলে না। এই অবিচারের প্রতি কি কোনো সুরাহা হবেনা। সত্যিই এই অবিচারের  কোনো সুরাহা কোনোদিনই হবেনা। শুধু প্রকৃতিদেবী মনে মনে মনে নিসঙ্গ বন্ধুহারা রঘুনাথ কে সান্তনা দিতে থাকে । 

       অবশেষে ছমাস পর ওই জায়গায় একটা বড় গুদামঘর তৈরি হয়। আর নানা শ্রমিকের আনাগোনায় ওই স্থান আজ মুখরিত। দেখে বোঝার উপায় নেই আগে ওই জায়গায় একটি বটগাছ ছিল। রঘুনাথবাবু আজও দুবেলা আসেন। বটের পাতাটা তিনি আজও খুব যত্ন করে রেখেছেন। এসে কিছুক্ষন ওই পাতাটার দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তারপর ধীরে ধীরে বাড়ি চলে যান। এইভাবেই চলতে থাকে একটার পর একটা বছর।